শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বিলুপ্তির পথে পুতুল নাচ, দিন চলে না শিল্পীদের

আশিকুর রহমান মিঠু
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

বিলুপ্তির পথে পুতুল নাচ, দিন চলে না শিল্পীদের
ছবি : ঢাকা মেইল

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচের আসর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাট-বাজার কিংবা খোলা মাঠের মঞ্চে এখন আর চোখে পড়ে না। যেখানে রংবেরঙের বাহারি পুতুল সাজিয়ে তার সঙ্গে সুতো বেঁধে হাতের সুনিপুণ দক্ষতায় বাদ্য, গান, নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হতো বিভিন্ন পালা। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় তিতাসের কূলঘেষে গড়ে ওঠা প্রাচীন জনপদ কৃষ্ণনগর। এই গ্রামে ১৮৭৯ সালে ৩১ ডিসেম্বর বৃন্দাবন দাসের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশের পুতুল নাচের জনক বিপিন দাস। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হয়ে জন্ম নিয়েও তিনি গুরুগৃহে প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শিখে শৈশব-কৈশোর কাটান। সেই সময়ে মনতলা ঘাট হতে গয়না ও মাল বোঝাই নৌকা ও জাহাজ নারায়ণগঞ্জ হয়ে কলকাতায় আসা-যাওয়া করত। এইসব জাহাজের দায়িত্বে থাকা পিতামহ গগন দাসের সঙ্গে কিছু সময় বিপিনও এই কাজ করেছিলেন বলে তাকে অনেকে বিপিন মাঝি বলে থাকেন। কৈশোর বয়সেই মাটির তৈরি পুতুল দেখে তার মনে হলো এগুলোকে যদি নাচানো যেত, তাহলে নৃত্যের তালে তালে অনেক কিছু বলা যেত। 


বিজ্ঞাপন


doll dance

বিপিন দাসই প্রথম আধুনিক পুতুল নাচের প্রচলন করেন। তিনি তৎকালীন সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে পুতুল নাচ করতেন বলে জানা যায়। এছাড়াও গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্যপট তুলে ধরা হয় এতে। কখনও কাঠুরিয়াকে বাঘের আক্রমণ, কখনওবা জেলেদের কুমির খেয়ে ফেলার করুণ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।  এই পুতুল নাচ দেখার জন্য শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার লোকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। পুতুল নাচ দেখে শিশুদের আনন্দকে আরও ছড়িয়ে দিতে তিনি প্রথমে মাটির পুতুল, দেবদেবীসহ বিভিন্ন আকৃতির পুতুল তৈরি শুরু করে ক্রমান্বয়ে স্টিক পুতুল, স্প্রিং পুতুল ও সুতোর তৈরি পুতুল বানান। তিনি একই এলাকার কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পুতুল নাচ সৃষ্টির মাধ্যমে চমক তৈরি করেছিলেন। কালক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে।

পরে এ শিল্পের হাল ধরেন জেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের গিরীশ আচার্য্য, মো. তারু মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা এলাকার ধন মিয়া, কালু মিয়া ও মো. রাজ হোসেন। তারা নিজেরাও পুতুল নাচের দল তৈরি করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বৃহত্তর কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, বিক্রমপুর, সিলেট, নোয়াখালী, চট্রগ্রামসহ সারাদেশ ব্যাপী এই পুতুল নাচ দলের পদচারণায় মুখরিত করে তুলেন। তাছাড়া ওই সময় ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় পুতুল নাচের প্রচলন ও জনপ্রিয়তা আলোড়ন তৈরি করেছিল।

doll dance


বিজ্ঞাপন


বিপিন দাস তার দুই ছেলে গোপাল দাস ও গোবিন্দ দাসকে এই পেশায় শিক্ষা দেন এবং তারাও ওস্তাদ হয়ে বিপিন দাসের স্বপ্নের পুতুল নাচ ভারতে ছড়িয়ে দেন। ওস্তাদ গোপাল দাস বাবা বিপিনের নির্দেশে ভারতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় শিষ্য তৈরি করে পুতুল নাচের দল গঠন করেন। ফলে পুরো ভারতবর্ষে এর জনপ্রিয়তা ও বিপিন দাসের পরিচিতিসহ বাড়তে থাকে। শুধু ভারতই নয়, তিনি পুতুল নাচের দল নিয়ে পৃথিবীর প্রায় ২৭টি দেশ ভ্রমণ করেন। 

দিনের পরদিন হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির এককালের বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ এ পুতুল নাচ। গ্রামের মেলাগুলোতেও এখন তেমন ভিড় জমছে না। পুতুল নাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর শিল্পীরা পড়েছেন বিপাকে। পুরনো পেশা আগলে রেখে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলো অর্থের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবার কেউ কেউ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে খুব দ্রুত এই লোকনাট্যের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা গেলেও বর্তমানে শিল্পী সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যসব পেশায় আর্থিকভাবে লাভবান হন বলে শিল্পীরা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

পুতুল নাচের শিল্পী খেলু মিয়া বলেন, আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন থেকে বাবার সঙ্গে মেলাতে আসা যাওয়া করতাম। সে সময় থেকে এ খেলা দেখতে দেখতে নিজের মধ্যে শেখার একটা আগ্রহ তৈরী হয়। বাবা হোসেন আলী মারা যাওয়ার পর  আমি এ পেশার হাল ধরি। 

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে পুতুল নাচ দেখিয়ে মানুষের মধ্যে আনন্দ দিতাম। বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকত এবং অনেক প্রজেক্টের কাজও করতাম। এখন আর তেমন কাজও পাইনা। দলের লোকজন নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। মাঝে মধ্যে যে কয়টা প্রোগ্রাম পাই তার টাকা দিয়ে তেমন পোষায় না।

পুতুল নাচকে টিকিয়ে রাখার পরবর্তী প্রজন্ম আসতে চাইবে কি না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে এ কাজটা এখন শিখাতে চাই না। কারণ আমাদের নিজেদের এখন দূরাবস্থা। যার কারণে ছেলে-মেয়েদের অন্য কাজের দিকে মনোযোগী হতে হচ্ছে। দিন দিন এ খেলাটি বিলুপ্তিতর পথে চলে যাচ্ছে। 

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

বাণী বিণা দলের মাষ্টার কবির হোসেন বলেন, ৩০ বছর ধরে পুতুল নাচের মাধ্যমে নাটক এবং বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করে আসছি। আগে প্রদর্শনী করে ভাল টাকা রোজগার করা যেত। প্রোগ্রাম পাই না। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ করতে হচ্ছে। সরকারে কাছে আমাদের দাবি বছরে ৬-৭ মাস আমাদের প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করে দিলে তাহলে পরিবার নিয়ে চলতে পারব।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির সভাপতি জয়দুল হোসেন বলেন, পুতুল নাচ এক সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ ছিল। এবং সারাদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুল নাচকে গুরুত্ব দেওয়া হত। এমন কি পুতুল নাচে যারা প্রয়াত শিল্পী ছিলেন তারা বিদেশে গিয়েও এই খেলার প্রদশনী করেছেন। 

কিন্তু কালের বিবর্তনে পুতুল নাচের শিল্পীরা অনেকটা পর্দার অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। কারণ পর্যাপ্ত পৃষ্টেপাষকতা দেওয়া হচ্ছে না।

তবে এ শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। 

প্রতিনিধি/এইচই

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর