শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ব্যাংকিং খাতের কর্মদক্ষতা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে: রেজা কিবরিয়া

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্যাংকিং খাতের কর্মদক্ষতা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে:  রেজা কিবরিয়া
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় বক্তব্য দিচ্ছেন ড. রেজা কিবরিয়া। ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংকিং খাতের কর্মদক্ষতা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ড. রেজা কিবরিয়া। 

তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সৎ ব্যবসায়ীদের কাছে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, যা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। আদর্শ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত।’

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। 

ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার প্রসঙ্গ টেনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, আগে টানা ৯০ দিন সুদ পরিশোধ না করলে ঋণকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হতো। এখন এক বছর সুদ না দিলেও খেলাপি বলা হচ্ছে না।’

এই ত্রুটিপূর্ণ সংজ্ঞা ব্যবহার করার পরও দেশে খেলাপি ঋণের হার ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করেন তিনি।

রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘বিশ্বের ৩৫টি দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কোথাও খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশ অতিক্রম করলেই উদ্বেগ তৈরি হয়। সেখানে বাংলাদেশে ৬১ শতাংশ খেলাপি ঋণ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সংকেত।’

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি অর্থনীতিতে আয়ের সুষম বণ্টনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘দেশের কোনো কোটিপতি বা ধনী মানুষকে অতিরিক্ত এক বা দুই হাজার টাকা দিলে তা অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু একজন গরিব মানুষকে ১০০ টাকা দিলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা খরচ করেন, যা বাজার ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাই প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’

প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে শেখা একটি উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় এবং বাজারে সবচেয়ে সস্তা চালের দামের অনুপাত দেখলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা বোঝা যায়। এ ধরনের সূচকের প্রতি জনবান্ধব সরকারের নজর রাখা উচিত।

সরকারের বিনিয়োগ নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু বড় বড় শপিং মল বা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে বিনিয়োগ করলে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য উৎপাদনমুখী শিল্প ও কারখানায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মানুষের আয় বাড়ে।

ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের পূর্বাভাস অনুযায়ী বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমছে, যা বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ঋণ পরিশোধের চাপও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ঋণ নেওয়াকে তিনি ‘চরম বোকামি’ বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়াই বেশি যুক্তিযুক্ত।

মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় হার নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি যদি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হবে। তাই অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ড. কিবরিয়া বলেন, বাজেটে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয় না। গত ১৫ বছরে সরকারের রাজস্ব আদায় কখনোই লক্ষ্যমাত্রার ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে বছর শেষে ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক, অ-ব্যাংক খাত ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়, যা মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এবং অর্থনীতিকে টেকসই পথে রাখতে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান।

টিএই/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর