- হার কমালে সাশ্রয় হতো দুই হাজার কোটি টাকা
- বিনিয়োগকারীদের কথা ভেবে পরিবর্তন আনেনি সরকার
- বাজেটে এসেছে কর সমন্বয়ের নতুন নিয়ম
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সে পথে হাঁটেনি সরকার। বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত সব সঞ্চয় কর্মসূচিতে বিদ্যমান মুনাফার হারই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা আগের হারেই মুনাফা পাবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হয়। তবে এবার নতুন কোনো হার নির্ধারণ না করে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর থাকা হারই বহাল রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সহকারী সচিব মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগের হারেই মুনাফা পাবেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমান মুনাফার হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, মধ্যবিত্তের অনেক পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালায়। তাই নতুন করে হার পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, হার কমাতে পারলে সরকারের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। কিন্তু মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিইনি।
আরও পড়ুন: টেকসই উত্তরণের জন্যই এলডিসি প্রস্তুতিকাল বাড়াতে চায় সরকার
বর্তমানে বিভিন্ন সঞ্চয় কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা পান। এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কিছুটা কম প্রযোজ্য হয়।
পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগে তা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ মুনাফা মিলছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি হিসাবেও একইভাবে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা বহাল রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অপরিবর্তিত রাখা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সঞ্চয়পত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার ফলে তারা কিছুটা হলেও আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের সুদের হার ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করাও প্রয়োজন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাকের মতে, সরকারের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ ছিল।
তিনি বলেন, একদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ বলা যায়।
তবে ব্যাংক খাতের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা থাকলে ব্যাংক থেকে আমানত সঞ্চয়পত্রে স্থানান্তরের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও পড়ুন: বাংলা কিউআরে মার্চেন্ট ফি সর্বোচ্চ ১ শতাংশ নির্ধারণ
এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে মুনাফার ওপর কাটা ১০ শতাংশ অগ্রিম করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নতুন নিয়মে এটি আর চূড়ান্ত কর নয়। করদাতারা এখন আয়কর রিটার্নে ওই কর সমন্বয় করতে পারবেন। প্রকৃত করদায়ের চেয়ে বেশি কর কাটা হলে তা ফেরতও পাওয়া যাবে।
তবে এ সুবিধা নিতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে এবং নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। ফলে যেসব ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী এতদিন টিআইএন ছাড়া বিনিয়োগ করেছেন, তাদেরও কর ফেরত পেতে কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সঞ্চয়পত্র এখনো লাখো মানুষের নির্ভরতার জায়গা। তাই বছরের শেষ পর্যন্ত মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।
এমআর/এআর




