রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মিসরের ইতিহাসে ২ ইউসুফ: একজন নবী, অন্যজন জেরুজালেমের মুক্তিদাতা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

মিসরের ইতিহাসে দুই ইউসুফ: একজন নবী, অন্যজন জেরুজালেমের মুক্তিদাতা

ইতিহাসে বহু বিদেশি সেনাপতি, শাসক ও রাষ্ট্রনায়কের কথা পাওয়া যায়। তবে মিসরের ইতিহাসে এমন দুই ‘ইউসুফ’-এর নাম বিশেষভাবে উজ্জ্বল, যাঁরা ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিদেশি হয়েও দেশটির ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। একজন ছিলেন আল্লাহর নবী হজরত ইউসুফ (আ.), অন্যজন মুসলিম বিশ্বের কিংবদন্তি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)। তাঁদের যুগ, দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও মিসরের ইতিহাসে দুজনই রচনা করেছেন অনন্য অধ্যায়।

প্রথম ইউসুফ: দুর্ভিক্ষ থেকে মিসরকে রক্ষা করা নবী

হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র। জন্ম কেনান অঞ্চলে (বর্তমান ফিলিস্তিনের অংশ)। ভাইদের ষড়যন্ত্রে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তিনি দাস হিসেবে মিসরে বিক্রি হন। এরপর দীর্ঘ পরীক্ষা, কারাবাস ও ধৈর্যের পথ অতিক্রম করে তিনি নিজের প্রজ্ঞা, সততা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার মাধ্যমে তৎকালীন শাসকের আস্থা অর্জন করেন।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি নিজেই রাজার কাছে দেশের অর্থ ও খাদ্যভাণ্ডারের দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন করেন। তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে সাত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে শুধু মিসর নয়, আশপাশের অঞ্চলও রক্ষা পায়।

যদিও তিনি মিসরের বাদশাহ ছিলেন না, তবে রাজার অধীনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা আজও মানবতার জন্য অনুকরণীয়।

আরও পড়ুন: ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক শুভ্রতা: জুলাইখার আসক্তি ও এক অলৌকিক সাক্ষ্য

দ্বিতীয় ইউসুফ: বিদেশি তরুণ থেকে মিসরের সুলতান

কয়েক শতাব্দী পরে মিসরের ইতিহাসে আবির্ভূত হন আরেক ‘ইউসুফ’। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। ইতিহাস তাঁকে চেনে ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবি’ নামে; যার অর্থ, ‘দ্বীনের কল্যাণ’ বা ‘দ্বীনের সংস্কার’।

১১৩৭ বা ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাকের তিকরিতে এক কুর্দি মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন একজন সম্মানিত সামরিক কর্মকর্তা। পরে দামেস্কে তাঁর শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও সামরিক জীবনের সূচনা হয়।

বিদেশি তরুণের মিসরের শীর্ষ নেতৃত্বে উত্থান: সে সময় মিসরে ফাতেমীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সিরিয়ার শাসক নূরুদ্দিন মাহমুদ জেনগির নির্দেশে সালাহউদ্দিন তাঁর চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহর সঙ্গে মিসরে আসেন।

চাচার মৃত্যুর পর মাত্র ত্রিশের কোঠায় তিনি মিসরের ওয়াজির (প্রধানমন্ত্রী) নিযুক্ত হন। ১১৭১ সালে ফাতেমীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে আইয়ুবি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন এবং মিসরের সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তলোয়ারের আগে ঐক্য: জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের আগে প্রায় এক দশক তিনি মুসলিম ভূখণ্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করেন। মিসর, সিরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলকে ধীরে ধীরে এক নেতৃত্বের অধীনে এনে তিনি বিশ্বাস করতেন- অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দূর না করে বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে স্থায়ী বিজয় সম্ভব নয়। এই রাষ্ট্রদর্শনই পরবর্তীতে তাঁর সামরিক সাফল্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নূরুদ্দিনের স্বপ্ন পূরণ: ১১৮৭ সালের হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন শান্তিপূর্ণভাবে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। প্রায় ৯০ বছর পর মুসলমানরা আবারও পবিত্র নগরীর দায়িত্ব ফিরে পায়।

এই বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর শিক্ষক ও অভিভাবকতুল্য নূরুদ্দিন মাহমুদ জেনগির একটি স্বপ্ন। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের আশায় তিনি আগে থেকেই একটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের মিম্বর তৈরি করিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলেও সালাহউদ্দিন বিজয়ের পর সেই মিম্বরটি মসজিদুল আকসায় স্থাপন করে তাঁর গুরুর অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করেন।

আরও পড়ুন: যে রণকৌশলে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেছিলেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবি

প্রতিশোধ নয়, মহানুভবতা: জেরুজালেম বিজয়ের পর সালাহউদ্দিনের আচরণ ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি বহু মানুষকে নিরাপদে শহর ত্যাগের সুযোগ দেন। তৃতীয় ক্রুসেডের সময় ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট অসুস্থ হলে তাঁর জন্য বরফ ও তাজা ফল পাঠিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এমনকি রিচার্ডের ঘোড়া নিহত হলে তাঁর জন্য দুটি উৎকৃষ্ট ঘোড়াও পাঠানো হয়। যুদ্ধের মাঝেও মানবিকতার এই পরিচয় তাঁকে প্রতিপক্ষের কাছেও সম্মানিত করে তোলে।

জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষক: সালাহউদ্দিন শুধু একজন বিজেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চারও পৃষ্ঠপোষক। মিসরে সুন্নি শিক্ষা বিস্তারে বহু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন। ফাতেমীয় যুগের অবসানের পর আল-আজহারও নতুন এক ধারায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং পরবর্তী সময়ে সুন্নি ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় বিদায়: ১১৯৩ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় ব্যক্তিগত ভাণ্ডারে ছিল মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) এবং অল্প কিছু রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম)। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসক হয়েও তিনি ব্যক্তিগত বিলাস-সম্পদ সঞ্চয় করেননি। জীবনের অধিকাংশ সম্পদ ব্যয় করেছিলেন জনকল্যাণ, দান-সদকা ও মানুষের সেবায়।

দুই ইউসুফ, এক অনন্য শিক্ষা

হজরত ইউসুফ (আ.) ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)- দুজনের মর্যাদা, পরিচয় ও দায়িত্ব এক নয়। একজন ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নবী; অন্যজন একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক। তাই তাঁদের মধ্যে মর্যাদাগত তুলনার কোনো সুযোগ নেই।

তবে ইতিহাসের এই দুই ইউসুফ একটি অভিন্ন সত্যের সাক্ষ্য দেন যে- জন্মস্থান নয়; ঈমান, সততা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থাই একজন মানুষকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী মর্যাদা এনে দেয়।

তথ্যসূত্র: সুরা ইউসুফ; বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ; অ্যামিন মালুফ; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা; ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি এনসাইক্লোপিডিয়া; ইবনুল আসির

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর