শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘সম্মানী, সম্মান, স্বীকৃতি— কোনোটাই ঠিকঠাক পান না চিত্রনাট্যকাররা’  

মো. ইনামুল হোসেন
প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সম্মানী, সম্মান, স্বীকৃতি— কোনটাই ঠিকঠাক পান না চিত্রনাট্যকাররা’  

নাটক-সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিত্রনাট্য। অথচ মাঝে মাঝেই চিত্রনাট্যকারদের সম্মান-সম্মানী নিয়ে হতাশার কথা শোনা যায়। অনেকে নিজের চিত্রনাট্যে নির্মিত কনটেন্টের ট্রেলার-টিজারে নিজের নামও খুঁজে পান না। ফলে অর্জনের বদলে ভারী হয় হতাশার ঝুলি। কেউ কেউ বদলান পেশা। কেউ কেউ পারিশ্রমিক, স্বীকৃতি আর সম্মানের জন্য লড়াই চালিয়ে যান। সেসব নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদ, নাজিম-উল-দৌলা, জাহান সুলতানা ও অনামিকা মণ্ডল।

দেশের প্রথম সারি চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদ বলেন, “চিত্রনাট্যকারদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো ঠিকঠাক পারিশ্রমিক না পাওয়া। লেখালেখিও যে একটা কাজ— এই মানসিকতা আমাদের দেশে এখনও তৈরি হয়নি। চাহিদা মতো পারিশ্রমিক চাইলে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ‘শুধু লেখার জন্য কেন এত টাকা নিতে হবে?”

মেকআপ আর্টিস্ট: মেলে না উপযুক্ত পারিশ্রমিক, জোটে না সম্মান

কোরবানির ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মালিক’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখলেও পারিশ্রমিক, স্বীকৃতি কোনোটাই— মেলেনি সিদ্দিকের। তিনি বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু সিনিয়রেরা পরামর্শ দিলেন, যেহেতু আমার লেখা স্ক্রিপ্টে অলরেডি হাত দিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, সেহেতু আমার নাম থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। এরপর আমি টাকার দাবি ছেড়ে দিয়ে বলেছিলাম যেন আমার নাম ব্যবহার না করা হয়। সিনিয়রদের কথায় আমি বিষয়টি ওখানেই বাদ দিই।’

তাঁর কথায়, ‘চিত্রনাট্যকারদের একটি সংগঠন থাকা ভীষণ জরুরি। বাইরের দেশগুলোতে অ্যাসোসিয়েশন খুবই সক্রিয়। কেউ পারিশ্রমিক না দিলে বয়কট করা, আইনি সহায়তা দেওয়া—এসব সংগঠনই করে। সামাজিক মাধ্যমে আমাদের একটি গ্রুপ ছিল। সেটিও কার্যকর নেই।’

২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর চিত্রনাট্যকারদের সংগঠন খোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি বলে জানান সিদ্দিক। দুটি কারণকে দায়ী করে বললেন, ‘প্রথমত, টেলিভিশন, ওটিটি এবং চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকারদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা আছে। তাঁরা একজন আরেকজনকে ক্ষমতা বা নেতৃত্ব দিতে চান না। দ্বিতীয়ত, অ্যাসোসিয়েশন চালাতে গেলে নির্দিষ্ট সময় পরপর ফি দিতে হয়। কিন্তু আমাদের অনেক চিত্রনাট্যকার আছেন যাঁরা পাঁচ হাজারেও চিত্রনাট্য লেখেন। অনেকে আবার কোনো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে পেরেই খুশি। ফলে অ্যাসোসিয়েশন করার মতো সক্ষমতা বা মানসিকতা তাঁদের নেই।’

স্টান্টম্যান: নেন জীবনের ঝুঁকি, দুঃসময়ে পাশে থাকে না কেউ

সিদ্দিক জানালেন মেধা স্বত্ব থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে স্ক্রিপ্ট রাইটারদের। তিনি বলেন, “ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ (আইপি) বা মেধা স্বত্ব অধিকার আইন অনুযায়ী নাটক, সিনেমার চরিত্রগুলো থেকে আজীবন ৫% রয়্যালটি পাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের প্ল্যাটফর্মগুলো চিত্রনাট্যের জন্য কোনো ফান্ড দেয় না। উল্টো কাগজে-কলমে সই করিয়ে ক্যারেক্টারগুলোর মালিকানাও নিজেদের নামে নেয়। অন্য কোথাও কাজের সুযোগ না থাকায় আমরাও সই করতে বাধ্য হই। ফলে নিজের তৈরি ক্যারেক্টার নিয়ে অন্য কোথাও কাজ করতে চাইলেও প্ল্যাটফর্মগুলো অনুমতি দেয় না।”

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনাট্যকার নাজিম-উল-দৌলা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হতে ক্ষুব্ধ হয়ে পেশা বদলেছেন। তিনি মনে করেন স্ক্রিপ্ট রাইটাররা উপযুক্ত সম্মানী, স্বীকৃতি, সম্মান— কোনোটাই পান না। তাঁর কথায়, “সম্মানী ঠিকঠাক দেওয়া হয় না। অধিকাংশ পরিচালক-প্রযোজক স্ক্রিপ্ট রাইটারদের সঙ্গে চুক্তিপত্র করার প্রয়োজন মনে করেন না। মুখে মুখে সারতে চান সম্মানীর বিষয়টি। চুক্তিপত্র করলেও দ্বিতীয় ড্রাফটের পেমেন্টের শর্ত মানেন না। অনেক সময় দেখা যায় বাজেট বা অন্য কোনো কারণে সিনেমাটি হয় না। সেক্ষেত্রে রাইটার পুরো লেখা শেষ করলেও তাঁকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। সিনেমা হলেও চুক্তি অনুযায়ী পেমেন্ট দেওয়া হয় না। কখনও পারিশ্রমিক চাইতে চাইতে রাইটার হাল ছেড়ে দেন। আবার কখনও পরিচালক বলেন, ‘সিনেমা হিট করে নাই, এক লাখের জায়গায় ৫০ হাজার দিচ্ছি, আর কথা বলবেন না। সিনেমা সফল হলে কৃতিত্ব নেন। কিন্তু ফ্লপ হলে সব দোষ রাইটারের ঘাড়ে চাপান।’

চিত্রনাট্যকারের কৃতিত্ব নিতে মুখিয়ে থাকেন পরিচালকদের কেউ কেউ। এরকম উল্লেখ করে বলেন, অধিকাংশ পরিচালক টকশো কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে চিত্রনাট্যকারের নাম বলেন না। মনে হয় তাঁরা নিজেরাই সব করেছেন। অনেক পরিচালক আছেন এক লাইন লিখতে বললে চার-পাঁচ শব্দের বানান ভুল করবেন, অথচ নিজের নামও চিত্রনাট্যকারের সঙ্গে জুড়ে দেন।”

আক্ষেপ প্রকাশ করে এ চিত্রনাট্যকার বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে অসম্মানের শিকার হন রাইটাররা। চিত্রনাট্যকার গল্পে প্রাণ দিলেও অধিকাংশ অভিনয়শিল্পীই তাঁর নাম জানেন না। কখনও জানার প্রয়োজনও মনে করেন না। শুটিংয়ে গেলেও আর্টিস্ট বা কলাকুশলীদের থেকে প্রত্যাশিত আচরণ পান না একজন চিত্রনাট্যকার।’

সিনেমা বা ওটিটির তুলনায় নাটক মাধ্যমটিকে কিছুটা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন তিনি। নাজিম-উল-দৌলার ভাষ্য, ‘সিনেমা, নাটক, ওটিটি— কোনো মাধ্যমই কাজের উপযুক্ত মনে হয় না। তার চেয়ে বিজ্ঞাপনী সংস্থার কপি রাইটার হওয়া তুলনামূলক অনেক ভালো। সেখানে রাইটারের নাম হয় না, কিন্তু সম্মানী ভালো। তবে ওটিটি বা সিনেমার চেয়ে তুলনামূলকভাবে নাটক কিছুটা ভালো। নাটকে পারিশ্রমিক আটকালেও লেখকরা স্বীকৃতি পান।’

‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’, ‘মায়াশালিক’ এবং ‘বসন্ত বৌরী’র মতো জনপ্রিয় কাজগুলোর চিত্রনাট্যকার জাহান সুলতানা মনে করেন চিত্রনাট্য লেখার পেছনে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম যায় সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক মেলে না। তাছাড়া স্ক্রিপ্টের জন্য একজন রাইটারের যতটুকু আলোচনায় আসা উচিত ততটুকু আলোচনায় তিনি আসেন না।

তিনি বলেন, ‘ছবির ট্রেলার-টিজারে লেখকের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। সিনেমা লেখকের একটি আবিষ্কার। তিনি দৃশ্যগুলো যেভাবে ভাবেন, পরিচালক সেভাবে দর্শকদের দেখান। যখন লেখক নিজের নামটা সেভাবে খুঁজে পান না, তখন প্রত্যাশার জায়গায় ঘাটতি তৈরি হয়। অনেকে আবার লেখককে চ্যাটজিপিটি মনে করেন। হুটহাট দৃশ্য পাল্টাতে বলেন। যেন ফরমায়েশ মাত্রই লেখা বেরিয়ে আসবে। লেখালেখি যে ধ্যানের মতো সেটা বুঝতে চান না। অনেকে লেখকদের সঙ্গে ফরমায়েশ খাটা লোকের মতো আচরণ করতে চান।’

পারিশ্রমিকের জটিলতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘লেখকরা পারিশ্রমিক সময়মতো পান না। নাটকের বা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের টাকা ঠিকই সময়মতো পকেটে যায়। কিন্তু লেখককে দেওয়া হয় ছয় মাস-এক বছর পর। সেটা পেতেও বারবার তাগাদা দিতে হয়। পারিশ্রমিক আদায়ে ফেসবুকে পোস্টও দিতে হয়।’

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন জাহান সুলতানা। বলেন, ‘একটি চিত্রনাট্য জমা দিলেই লেখকের কাজ শেষ হয় না। তাঁকে পরিচালক-প্রযোজকের চাহিদানুযায়ী ড্রাফটের পর ড্রাফট লিখতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত খাটুনির জন্য বাড়তি মজুরি দেওয়া হয় না। অথচ একজন নায়ক বা নায়িকাকে একদিন বেশি শুটিং করালে মজুরি দিতে হয়। আমি ছয় মাস ধরে একটি চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরিচালক হঠাৎ ফোন দিয়ে বলতেন সবগুলা সিন ফেলে দিয়ে নতুন করে শুরু করো। সেটা করতে হলে তো ভাবার জন্যও সময় দিতে হয়!’

এ চিত্রনাট্যকার মনে করেন আত্মতুষ্টি ছাড়া স্ক্রিপ্ট রাইটারদের জন্য ইতিবাচক কিছু নেই। বলেন, ‘নিজের চিন্তা দর্শক দেখছেন, সমাজের কাছে মেসেজ যাচ্ছে, এই অনুভূতি বোঝানোর মতো না। এই আত্মতুষ্টি ছাড়া স্ক্রিপ্ট রাইটারদের জন্য ইতিবাচক কিছু নেই।’

তিনি বলেন, ‘নাটকের ক্ষেত্রে ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে লিখতে হয় বলে গল্প বলার সুযোগ কম থাকে। ওটিটির কাজে একটু আরাম পেয়েছি। কারণ ওখানে ইমোশনগুলো ভালো মতো প্রকাশ করা যায়। মন খুলে খেলা যায়। কিন্তু পারিশ্রমিকের দিক থেকে নাটকটাই ভালো। ওটিটিতে একটা লেখার পেছনে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়, সেই অনুযায়ী প্রপার রেমুনারেশন পাওয়া যায় না।’

তবে চিত্রনাট্যকার অনামিকা মণ্ডলের অভিজ্ঞতা এতটা তিক্ত না। তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচালক বা অভিনয় শিল্পীদের কাছ থেকে আমি ভালো মূল্যায়ন পাচ্ছি। প্রকৃত শিল্পীরা সম্মান করেন। কখনও অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়নি। তাছাড়া নারী চিত্রনাট্যকার হিসেবে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রেও বৈষম্য বোধ হয়নি। তবে অন্যদের মতো আমারও পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার অভিজ্ঞতা আছে। অনেকে পারিশ্রমিক আত্মসাতের সুযোগে থাকেন। আজকাল এরকম প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে না হলেও শুরুর দিকে হয়েছে। দুই-একটি নাটকের পারিশ্রমিক পাইনি। একটি সিনেমা লিখেছিলাম, অর্ধেক সম্মানীও পাইনি।

বর্ষীয়ান চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক ছটকু আহমেদ জানান, পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগের চিত্রটি আসলে এমন নয়। অনেকে সম্পর্কের খাতিরে চুক্তি ছাড়াই কাজ করেন। পরে পারিশ্রমিক না পেয়ে অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি মনে করেন চিত্রনাট্যকারদের নিজের অবস্থানে শক্ত থাকা উচিত। সম্মানী আগে বুঝে নিয়ে কাজে হাত দেওয়ার পরামর্শ তার। 

ছটকু আহমেদ বলেন, ‘আমি চিত্রনাট্যকার সমিতির নির্বাচিত মহাসচিব ছিলাম। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন কোনো অভিযোগ কখনও পাইনি। আমার নিজের লেখা সাড়ে চারশ সিনেমার একটাতেও কেউ এক টাকা বাকি রাখেনি। জসিম, ডিপজল বা অনন্ত জলিল—সবাই আমাকে আগে টাকা দিয়ে গেছেন। তারপর আমি কাজ করেছি। নিয়ম হলো আগে টাকা নেওয়া, তারপর চিত্রনাট্য করা।’

ইএইচ/আরআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর