বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

প্রথম বিদেশ সফরে কূটনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রথম বিদেশ সফরে কূটনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার
প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত
  • প্রথম সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতির অগ্রাধিকার
  • মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও এফটিএতে অগ্রগতি
  • চীনা বিনিয়োগে জোরালো উদ্যোগ
  • ১৮০ দিনের সংস্কার ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল
  • বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতায় নতুন গতি
  • ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির বার্তা

ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মাথায় প্রথম বিদেশ সফরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গন্তব্য হিসেবে বেছে নিলেন এশিয়ার শক্তিশালী দুই দেশ মালয়েশিয়া ও চীনকে। তার প্রথম এই বিদেশ সফর দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছে। মালয়েশিয়া ও চীন সফর শুধু সৌজন্য বিনিময় বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি নতুন সরকারের অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন।

এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ এলডিসি-উত্তর বাস্তবতায় প্রবেশ করে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের নতুনভাবে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম বিদেশ সফরকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও আসিয়ান সংযোগ এবং চীনে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের কৌশল স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথম বিদেশ সফরেই অর্থনৈতিক কূটনীতির বার্তা

সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দেয়। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়। অনেকের ধারণা ছিল, আঞ্চলিক বাস্তবতায় ভারত হতে পারে প্রথম গন্তব্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রাধিকার হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ। সফরের প্রতিটি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রায় সব বৈঠক ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা।

শ্রমবাজার ও মুক্ত বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শ্রমবাজার পুনরুজ্জীবিত করা। বর্তমানে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নতুন শ্রমিক নিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল।

PM3

কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ চায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও পুরোপুরি চালু হোক এবং নতুন কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমবাজার চালু হলে শুধু রেমিট্যান্স বাড়বে না, দেশের বেকারত্ব কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে।

এফটিএ ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ

বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এর বড় অংশই মালয়েশিয়ার পক্ষে। বাংলাদেশ আমদানি করছে বিপুল পরিমাণ পাম অয়েল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামাল, কিন্তু রফতানি তুলনামূলকভাবে কম।

আরও পড়ুন

‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার’

এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে এবং শুল্ক বাধা কমে যাবে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, হালাল খাদ্য, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প বাজার ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু দেশটির বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করবে না, বরং পুরো আসিয়ান অঞ্চলের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ সহজ করবে।

এ কারণে অনেকেই মালয়েশিয়া সফরকে বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ

সফরের আগে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের আম রফতানির সম্ভাবনা তৈরি হওয়াও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও কারিগরি প্রচেষ্টার পর দেশটির বাজারে বাংলাদেশের তাজা আম প্রবেশের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু আম রফতানির সুযোগ নয়; বরং অন্যান্য ফল, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানির পথও খুলে দিতে পারে। মালয়েশিয়ার বাজারে সফল হলে ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য আসিয়ান দেশেও বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

চীন সফরে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন প্রত্যাশা

মালয়েশিয়া সফরের পর প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসেন। বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নিয়ে তিনি চীনা ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তার বৈঠকগুলো ছিল সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চেরি গ্রুপ, হানদা গ্রুপ এবং অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

‘এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়’ গড়ার আহ্বান

বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য সফরের অর্থনৈতিক বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনের ১২৫ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীর উপস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশকে ‘এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়’ হিসেবে গড়ে তোলার যাত্রায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান।

PM2

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত। তিনি চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়ে বলেন, চীন যখন উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের শিল্প খাতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনের একটি অংশ নতুন ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য খুঁজবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর অন্যতম।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, এটি এমন একটি অংশীদারিত্ব যেখানে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।

১৮০ দিনের সংস্কার পরিকল্পনার ঘোষণা

চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে একটি ১৮০ দিনের সংস্কার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কাজ চলছে।

তিনি আশ্বাস দেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন। নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু হলে কোনো নতুন প্রতিষ্ঠান ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে পারবে বলেও তিনি জানান।

চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং খুলনার মোংলায় দ্বিতীয় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব অঞ্চলে উন্নত লজিস্টিক সুবিধা, সমুদ্রবন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

আরও পড়ুন

তারেক-লিউ বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বারোপ

এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে বিডায় চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ডেস্ক এবং একটি পৃথক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও সেবা সহজে পাওয়া যায়।

চীনে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপনের ঘোষণা

বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘ইনভেস্টমেন্ট অফিস’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসার আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ ও সহায়তা পাবেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘোষণাগুলো কেবল কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের নতুন অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। বিশেষ করে উৎপাদন শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পে চীনা বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও রফতানি সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

PM4

বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে চীন বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস। নতুন সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এই বিনিয়োগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে নতুন অগ্রগতি

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে দুটি চুক্তি এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং গণমাধ্যম সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিস্তা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অবকাঠামো উন্নয়ন

যদিও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবুও এটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। একই সঙ্গে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়নের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশে উৎপাদনভিত্তিক শিল্পের প্রসার ঘটবে। এছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উন্নত উৎপাদন শিল্পে সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

জিডিআই ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা

কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, জিডিআইতে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হওয়ার পর এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক বার্তা কী?

এই সফরকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারিতে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকছে না; বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

আরও পড়ুন

তিস্তা প্রকল্পে গতি আনতে বাংলাদেশ-চীনের ঐকমত্য

সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে দেশে ফিরছেন। বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজছে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের দিকে এগোতে চায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতি অনুসরণের ইঙ্গিতও দিয়েছে সরকার।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব, যা বলছেন বিশ্লেষকরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তবায়নের ভিত্তিতে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে গেলে রেমিট্যান্স বাড়বে, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে রফতানি সম্প্রসারিত হবে, আর চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নতুন গতি পাবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এই সফর তাৎক্ষণিক কোনো অর্থনৈতিক বিপ্লব নয়; বরং আগামী এক দশকের উন্নয়ন কৌশলের ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সেগুলোর সুফল কতটা সাধারণ মানুষের জীবন ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়।

PM5

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরকে শুধু অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে ভূরাজনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত।

এই বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদার। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী। ফলে এই তিনটি শক্তির মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. শওকত আলী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও দক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। একটি সফল সরকারের পরিচয় হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে যা যা হলো

তিনি মনে করেন, তারেক রহমানের সরকারকে এমন একটি পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমানভাবে শক্তিশালী ও কার্যকর থাকে।

তার ভাষায়, এটি মূলত কূটনৈতিক দক্ষতার বিষয়। একজন দক্ষ কূটনীতিক যেমন বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখেন, তেমনি বাংলাদেশকেও এমন নীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে নিশ্চিত করা যায়।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়গুলোই প্রধান বিবেচ্য হয়। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরও সেই স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ।

তিনি মনে করেন, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সঙ্গে বিশেষ কোনো ভূরাজনৈতিক বার্তা খোঁজার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়া, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা বাস্তবায়নই এ সফরের মূল উদ্দেশ্য। তার মতে, এ সফরের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করবে।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর