জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেড় হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা হত্যার দায় পতিত আওয়ামী লীগের ওপর। এছাড়া ১৬ বছরের শাসনামলের অগণিত গুম, খুন, দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের অভিযোগ তো আছেই। এত অভিযোগ এবং ব্যাপকভাবে জনসমর্থন হারানোর পরও ‘গায়ের জোরে’ রাজনীতিতে ফিরতে মরিয়া দলটি।
তারই অংশ হিসেবে গত প্রায় দুই বছর ধরে বিক্ষিপ্তভাবে নাশকতা সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আর শক্তিমত্তা জাহিরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের দেশে থাকা নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা। মাঝেমধ্যে ভাড়া করা লোক দিয়েও এখানে-সেখানে ককটেল নিক্ষেপ, অগ্নি সংযোগ এবং ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে দলটিকে।
এছাড়া ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই ফিরবেন- এমন বার্তাও অনবরত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়ে চলেছে দলটির কর্মী-সমর্থকরা। দলটির শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই বিদেশে পলাতক, অনেকে দেশে কারাবন্দি। বিদেশে পলাতকরাও নানাভাবে দিচ্ছে তাদের নেত্রীর ফেরার বার্তা। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ফেরার পথ কি এতই সহজ? রয়েছে প্রশ্ন।
সবশেষ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্যাপকভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল দলটির পক্ষ থেকে। কিন্তু মঙ্গলবার (২৩ জুন) দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিরোধী দলগুলো সতর্ক থাকলেও কোথাও তেমন দেখা মেলেনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।
এদিন পতিত দলটির পক্ষ থেকে ছিল না কোনো কর্মসূচির তোড়জোড় কিংবা নেতাকর্মীদের স্লোগান। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সড়কের দুই পাশে ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। একই অবস্থা দেখা যায় দলটির ধানমন্ডি এবং তেজগাঁও কার্যালয়ের সামনেও।
ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি এবং জামায়াতের কর্মসূচি ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে ধরনের উপস্থিতি দেখা যেত, অনেকটা একই দৃশ্য এবার দেখা গেছে পতিত দলটির বিরুদ্ধেও।
বিএনপি নেতাকর্মীদের সাফ কথা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলকে কর্মসূচি পালন করতে দেবেন না তারা। এ কারণেই কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা মাঠে নেমেছিলেন। আরও মাঠে ছিলেন জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলনসহ বিরোধী দলগুলোও।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুরসহ ছয় জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একইভাবে বিজিবি মোতায়েন করা হয় ঢাকাসহ পাঁচ জেলায়।
এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের কয়েক দিন ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ছোটোখাটো মিছিল করলেও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তেমন তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি। তার মধ্যে আবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দলটির ১৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ফলে বারবার ফেরার বার্তা দিয়েও গত প্রায় দুই বছরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে পারেনি দলটি।
অন্যদিকে ক্ষমতা হারানোর পরই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সমস্ত কার্যক্রম সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করে। দলটির অন্যতম অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগকে তো নিষিদ্ধই ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে মাঠের কর্মসূচিতে তারা একেবারেই অনুপস্থিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, এখন কী করবে আওয়ামী লীগ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় ক্ষমতা হারানো দলটির সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।
প্রথমত, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকতে পারে। নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসমর্থনের সংকট মিলিয়ে দলটির পুনর্গঠন দীর্ঘায়িত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দলটির ভেতরে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগ যদি শেখ হাসিনানির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনে এবং অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা করে, তাহলে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে আওয়ামী লীগ। ইতিহাস বলে, বৃহত্তম এই দলটি অতীতেও একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চতুর্থত, রাজপথে শক্তি দেখিয়ে আবার ফিরে আসা। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভুল করবে। বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন একটা সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে। দৃশ্যত দলটি এখনো এই পথেই হাঁটছে। তবে অনেকেই এটাকে ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবার মনে করছেন, দুটি উপায়ে দেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারে আওয়ামী লীগ।
এক. অতীতের সমস্ত ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া, একইসঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব দিয়ে দল পুনর্গঠন করা। যদিও এক্ষেত্রেও জনসমর্থন ফিরে পাওয়া এবং দলের আগের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা যোজন যোজন দূরের পথ।
দুই. আওয়ামী লীগের ফেরার অন্য পথটি হলো- আরেকটি সফল গণঅভ্যুত্থান। এ পথটি আরও কঠিন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কেবল একটি বা দুটি রাজনৈতিক দল দিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয় না। সে দল যতই শক্তিশালী হোক না কেন। গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হলে সেখানে জনসাধারণের বিপুল অংশগ্রহণ আবশ্যক। যেমনটা দেখা গিয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। সেখানে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও বিপুল ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ ছিল।
সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কি পারবে জনগণকে তাদের পক্ষে মাঠে নামাতে, সেই জনসমর্থন কি দলটির আছে? বর্তমান বাস্তবতায় এমন প্রশ্নও উঠছে ঘুরেফিরে।
অন্যদিকে দলটির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর ক্ষোভ রয়েছে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের অনেক নেতারাও মনে করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরত আসার অন্যতম উপায় ভুল স্বীকার করা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনলাইনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, নানা লিখিত এবং অডিও বিবৃতিও দিয়েছেন। কিন্তু তাকে প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি।
এমন বাস্তবতায়ও প্রশ্ন উঠছে, আওয়ামী লীগ কি তবে দেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল? কী করবে দলটি? মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনাই বা কী? চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দলটি কি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে? অনেক প্রশ্ন, উত্তর অজানা।
ফলে ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলটি কি আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি অতীতের গৌরবের স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই অন্ধকারে পথ খুঁজবে— তা সময়ই বলে দেবে।
এএইচ




